শোভাবাজার রাজবাড়িতেই আয়োজিত হয় কলকাতার প্রথম জমকালো, বড়মাপের দুর্গাপূজা, যার ফলে আজও অনেক শহরবাসীর কাছেই শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো না দেখলে পুজো সম্পূর্ণই হয় না। উত্তর কলকাতার শোভাবাজার এলাকা, এবং বিশেষ করে সেই এলাকায় অবস্থিত রাজবাড়ি, শহরের অবশ্য দ্রষ্টব্য ১০টি স্থানের মধ্যে একটি, বিশেষত দুর্গাপুজোর সময় তো বটেই।

একটি তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, শোভাবাজারের কাহিনি সেই সময় শুরু, যখন কলকাতা শহরেরই কোনও অস্তিত্ব ছিল না, এবং তখনও পৃথক পৃথক গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল সূতানুটি, কলিকাতা, এবং গোবিন্দপুর, যে তিনটি গ্রামকে একত্রিত করে শহরের পত্তন করেন জোব চার্নক। তা এই কাহিনি কতকটা এরকম – বসাক নামে বাংলার এক ধনী ব্যবসায়ী পরিবার তাঁদের আদি নিবাস সপ্তগ্রাম থেকে উঠে এসে বসতি গড়েন সূতানুটিতে। নতুন জায়গায়ও বজায় থাকে তাঁদের ধনভাগ্য, এবং জঙ্গল কেটে সাফ করে বাড়ি তৈরি করেন তাঁরা। ১৬৯০ বা তার কাছাকাছি সময়ে শহর কলকাতার ভিত প্রতিষ্ঠা করেন জোব চার্নক, এবং ১৭৫৭ সালে দেখা যায়, কলকাতার সবচেয়ে ধনী পরিবারগুলির মধ্যে গণ্য হচ্ছে বসাক পরিবারও। এবং এই সমৃদ্ধি ও খ্যাতির কারণে পরিবারের তৎকালীন কর্তা শোভারাম বসাকের নামেই একটি এলাকার নাম হয় শোভাবাজার।

কর্তা ছিলেন নবকৃষ্ণ দেব, এই এলাকায় বাস করতে আসেন ১৭৫৮ সালের পরে, যখন তাঁদের আদি নিবাস গোবিন্দপুরে ফোর্ট উইলিয়ামের জন্য জায়গা খালি করতে নিজেদের ভিটে থেকে উৎখাত হয়ে যান তাঁরা। ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের পক্ষ থেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ পান দেব পরিবার, যা দিয়ে পটলডাঙ্গার কাছে জমি কেনেন তাঁরা। এখানে কতদিন তাঁদের বাস ছিল, তা জানা যায় না, কিন্তু নবকৃষ্ণ দেব পরিবারের কর্তা হওয়ার পর শোভাবাজারে উঠে আসেন তাঁরা, কারণ এখানে তখনও জমির দাম অপেক্ষাকৃত কম।

অল্পবয়সেই পিতৃহারা নবকৃষ্ণের মা ছিলেন শক্ত মহিলা, এবং পুত্রের ভবিষ্যৎ উন্নতির কথা ভেবে নিশ্চিত করেছিলেন যে ছেলে যেন ইংরেজি এবং আরবি সহ একাধিক ভাষা শেখে। প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে নবকৃষ্ণ ব্রিটিশ আধিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত মেলামেশা শুরু করেন, যেমন করতেন তখনকার অনেক ব্যবসায়ীই, এবং ক্রমশ হয়ে ওঠেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরফের এক মধ্যস্থতাকারী। কিন্তু ব্রিটিশদের সঙ্গে তাঁর সহযোগিতার এখানেই শেষ নয়। নবকৃষ্ণ দেব কিন্তু নিজেকে ব্রিটিশদের কাছে একরকম বিকিয়েই দিয়েছিলেন, কোম্পানির কর্তাদের সঙ্গে যেচে ঘনিষ্ঠতা করেছিলেন সম্পত্তি এবং অর্থের লোভে।

অনেকেই সম্ভবত জানেন না ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের নেপথ্যে নবকৃষ্ণের ভূমিকার কথা। সেই যুদ্ধ, যা ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত গড়ে দেয়, যে ভিত টলানো যায় নি পরবর্তী ২০০ বছরেও। যেসময় বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাহ নিজের রাজত্ব এবং কলকাতা শহর ব্রিটিশদের গ্রাস থেকে বাঁচানোর জন্য লড়ছেন, সেসময়ই তাঁর সেনাপতি মীর জাফর ব্রিটিশদের সঙ্গে চক্রান্ত করছেন, সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করে নিজে নবাব হওয়ার লোভে। অন্যদিকে নেপথ্যে, বিশেষ করে পলাশীর যুদ্ধের প্রাক-মুহূর্তে, ব্রিটিশদের সাহায্য করে গেছেন নবকৃষ্ণ, কোম্পানির কর্মচারী রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে, রচনা করেছেন সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। সিরাজের রাজত্বের পতনের পর তাঁর তোষাখানা লুট করতেও ব্রিটিশদের সাহায্য করেন নবকৃষ্ণ।

বেশিরভাগ মানুষই জানেন না, ক্লাইভ এবং নবকৃষ্ণের বন্ধুত্ব ঠিক কতটা গভীর ছিল। পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশদের বিজয়োৎসব পালন করার উদ্দেশ্যে শোভাবাজারে নিজের বাড়ির দরজা খুলে দেন নবকৃষ্ণ। কথিত আছে, প্রথম “বাড়ির পুজোর” এই উপলক্ষ্যেই আয়োজন করেন তিনি, যেখানে দেবীর পায়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করার আমন্ত্রণ পান ক্লাইভ। তবে এই পুজোয় শ্রদ্ধাভক্তির পাট বিশেষ ছিল না, ছিল ব্রিটিশ অতিথিদের মন পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। খাদ্য-পানীয় বাদেও পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশিই ছিল বাইজি নাচের ব্যবস্থাও।

 

ঠাকুরদালানের যেখানে প্রতিমা বসানো হয়, তার একেবারে মুখোমুখিই ছিল নাচঘর। আজ ভগ্নদশা তার, জলহাওয়া অবাধে খেলে সেখানে, কারণ ছাদ ভেঙে পড়ার পর আর মেরামত করা হয় নি। নাচঘরের একদিকে একটি সিল করা দরজা, যেখান দিয়ে যাতায়াত করতেন বাইজিরা, পরিবারের বাসভবনের থেকে আলাদা পথে।

এই পুজোর বিপুল সাফল্য অনুপ্রেরণা জোগায় অন্যান্য ধনী ব্যবসায়ীদের, যাঁরা স্ব স্ব গৃহে ধুমধাম সহকারে চালু করে দেন দুর্গাপূজা। সবাই অবশ্য বাইজির ব্যবস্থা রাখতেন না। বাড়ির পুজোয় কোনও ইউরোপীয়ের, বিশেষ করে ব্রিটিশের, উপস্থিতি, হয়ে ওঠে অর্থ, সামাজিক প্রতিষ্ঠা, এবং কোম্পানির সঙ্গে সান্নিধ্যের প্রতীক।